সোরেন্টোর পথে

ভোরের আলোয়ে চোখ খুলতেই দেখলাম নীল আকাশ, মিশে যাচ্ছে সমুদ্রে। ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিয়ে চারতলা হোটেলের জানালাটা আরেকটু খুলে দিলাম। একটা একলা মালবাহী জাহাজ চলেছে নিরুদ্দেশের ঠিকানায়। কাল রাতের বৃষ্টিভেজা মেঘেদের সীমানার বাইরে পাঠিয়ে আকাশজোড়া ঝকঝকে রোদ্দুর। আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠে বসলাম। ভেনিসকে বিদায় জানিয়ে এবার বেরিয়ে পড়ার পালা ইটালির দক্ষিণে এক ছোট্টো শহর সোরেন্টোর উদ্দেশ্যে।

ভেনিস সান্টা লুসিয়া স্টেশন থেকে সকাল ১০ টায় ট্রেন ছাড়বে নেপলস্ এর জন্য। ফ্রেসিয়গেন্টো – ইটালির দ্রুততম ট্রেন, দেখতে অনেকটা জাপানের বুলেট ট্রেনের মত, ৭৫৯ কিমি পথ পেরিয়ে গন্তব্যে পৌছে দেবে নাকি মাত্র ৫ ঘন্টায়। রীতিমত উত্তেজনা বোধ করছিলাম, প্রথমবার এরকম একটা ট্রেন সফরে। যথাসময়ে ট্রেন এসে থামলো। আমি আর অজন্তা দুজনেই সিটে বসে ইমপ্রেসড্। কামরার ভিতরটা যে কোনো প্লেনের ভিতরকেও লজ্জা দিতে পারে। থ্রি স্টার রেঁস্তরা বিশেষ আকর্ষণ। মাথার ওপর বসানো স্ক্রিনে ভেসে উঠছে চলন্ত ট্রেনের একেবারে সামনে আর পিছনে বসানো ক্যামেরার লাইভ ফুটেজ। হঠাৎ তাতে ফুটে উঠল – এই ট্রেন তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে জাপান। বুলেট ট্রেনের সার্থক উত্তরাধিকারী!

 

IMG_1403
পথে যেতে যেতে চারপাশের দৃশ্যগুলো যেন বড় চেনা মনে হয়। পূর্বে আ্যড্রিয়েটিক সমুদ্র, পশ্চিমে তেহরানিয়ান সমুদ্র (ভূমধ্যসাগরের অংশবিশেষ) আর দক্ষিণে আয়োনিয়ান সমুদ্রের মাঝে ইটালিয়ান পেনিনসুলাকে উত্তর থেকে দক্ষিণে লম্বালম্বি চিরে দিয়ে ১২০০ কিমি চলে গেছে দিগন্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আ্যপেনাইন পর্বতমালার সারি। দিগন্তবিস্তৃত সবুজ জমি, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে হাই টেনশান কারেন্টের লাইন। জমির আলের ধারে ডাঁই করে রাখা কাটা ফসল। ভারতের মতই ইটালির প্রধান খাদ্যশস্য চাল। বাংলায় যেমন গ্রামে ধান কাটার পর খড় ডাঁই করা হয় খড়ের গাদায়, এখানে দেখলাম কাটা খড় দিয়ে বিরাট বিরাট সাইজের গোলাকার বান্ডিল বানিয়ে রাখে জমিতেই। দেখে মনে পড়িয়ে দেয় উইন্ডোজ ৭ এর বিখ্যাত ওয়ালপেপারের কথা।

20150601_144534.jpg

20150601_150022.jpg
স্ক্রিনে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম – ২৯৮ কিমি প্রতি ঘন্টায় দৌড়চ্ছে ট্রেন। মাঝে মাঝে অন্ধকার করে দিচ্ছে পাহাড়ের বুক ফুঁড়ে তৈরি, যাত্রাপথে চলে আসা টানেল। রাজধানী রোম ছুঁয়ে গাল্ফ অফ নেপলস্ এর ধারের শহর নেপলস্ পৌঁছলাম বিকেল সাড়ে তিনটেয়। এখান থেকে ট্রেন বদল করে যেতে হবে সোরেন্টো। নাপোলি সেন্ট্রাল তিনতলা স্টেশনের একেবারে নীচের তলা হল পিয়াজ্জা গ্যারিবল্ডি স্টেশন – এখান থেকে ছাড়বে পরের ট্রেন।

আধঘন্টা মতন সময় তখনও হাতে। হঠাৎই আবিষ্কার করলাম আমাদের সহযাত্রী টলিউডের এক বিখ্যাত তারকা অভিনেত্রী। স্বামী-স্ত্রী গরমের ছুটি কাটাতে এসেছেন। কাকতালীয়ভাবে ওনারাও আজ একই ট্রেনে ভেনিস থেকে এসেছেন। বিদেশের মাটিতে বাঙালির দেখা পেলে আড্ডা জমে উঠতে দেরি হয়না। এক্ষেত্রেও অন্যথা হল না। দুজনেই মিশুকে মানুষ এবং সেলিব্রিটিসুলভ কোনো আড়ম্বরতা একেবারেই নেই। নিখাদ আড্ডার মাঝখানেই দূর থেকে উঁকি মারল সোরেন্টোগামী ট্রেন। সাময়িক ছেদ পড়ল গল্পে।

20150604_093337.jpg
১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠত এই সারকামভিসুভিয়ানা রেলওয়ে দেশের বাকী মেনলাইনের থেকে একেবারেই আলাদা। এটা ইটালির একমাত্র ন্যারোগেজ লাইন – ৯০০ মিলিমিটার চওড়া ট্র্যাকে চলা ট্রেন দক্ষিন ইটালির প্রধান ভরসা। ন্যারোগেজ বলতে প্রথমেই মনে পড়ে দার্জিলিঙের টয়ট্রেনের কথা। যদিও আমাদর দেশে ন্যারোগেজের মাপ ৬১০ মিলিমিটার। লোকাল ট্রেন হিসাবে ভারতীয় লোকাল ট্রেনের সঙ্গে বিশেষ পার্থক্য নেই। হকার, ভিখিরি নেই বটে তবে কামরার দেওয়ালের ভিতরে বাইরে স্থানীয় ছেলেদের স্প্রে-পেন্ট দিয়ে লেখা ও আঁকা ক্ষোভ কিংবা প্রতিবাদের গ্রাফিটি কোলাজ, ঠাসা ভিড় আর গায়েপড়া চড়া রোদ হঠাৎ করে ইউরোপের অন্যরকম ছবি তুলে আনে। সরকারী আর্থিক পরিকাঠামো এবং পরিষেবা অনেক ক্ষেত্রেই এখানকার নতুন প্রজন্মের রোষের কারন। দারিদ্র্য আর বেকারিত্ব সরকারের বড় মাথাব্যাথা এইখানেও।
কপাল ভাল, খানিক্ষনের মধ্যেই আমরা চারজন বসার সিট পেয়ে গেলাম। ডানদিকে জানালার বাইরে তাকাতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। আধ কিলোমিটার দূরে গাল্ফ অফ্ নেপলস্ এর গাঢ় নীল শান্ত জল কিনারা বরাবর এসে ধাক্কা খাচ্ছে। বাঁদিকে বিক্ষিপ্ত আ্যাপেনাইনের জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়। মাঝেমধ্যে ছোটো ছোটো টানেল পেরিয়ে চলেছে ট্রেন। প্রায় দেড় ঘন্টার রাস্তা এখনো। পাশে বসা এক প্রবীণ জার্মান দম্পতি ভারতীয় দেখে বেশ উৎসাহ নিয়ে গল্প শুরু করল। এক সময়ে ভদ্রলোক ভারত আর শ্রীলঙ্কায় ঘুরে গেছেন। রিটায়ারমেন্টের পর এখন দুজনে জার্মানির ছোট্ট বন্দর শহর কিয়েলের বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন বছরে প্রায় ৩-৪ মাস বিভিন্ন দেশে গরমের আমেজ উপভোগ করতে। এবারের গন্তব্য আ্যমালফি কোস্ট। বেড়ানো, খাওয়া-দাওয়া, বিভিন্ন অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে শুনতে বিকেল ৫টা নাগাদ অবশেষে পৌঁছলাম সোরেন্টো।
ছোট্ট ছিমছাম মফস্বল স্টেশন থেকে দুই পরিবারকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। পেটে ছুঁচো অনেকক্ষন থেকেই ডন দিচ্ছিল। মিনিট দশেক হাঁটাপথ পেরোবার আগে একটা ছোট্টো লোকাল পিজা কর্নারে ঢুকে পড়লাম। পিজার জন্মস্থানে এসে পিজা না খাওয়া নিদারুণ অন্যায়। আমার জন্য থিন ক্রাস্ট পিজা আর অজন্তার জন্য চিকেন বল অর্ডার দিয়ে বসলাম।
শোনা যায় প্রাচীন গ্রিসে ফ্লোকেসিয়া নামে পরিচিত রুটি নাকি আজকের পিৎজার প্রপিতামহ। যদিও ষোড়শ শতকে নেপলস্ শহরে গেলাটা নামক একরকম রুটির নামকরন হয় পিৎজা। গরীবদের খাবার হিসেবে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও ইটালিয়ান রসুইতে বহু বছর পদ হিসেবে ব্রাত্য থেকে গিয়েছিল পৃথিবীর সর্বাধিক জনপ্রিয় এই ফাস্টফুড। অবশেষে ১৮৮৯ সালের ১১ই জুন, ইটালির মহারানি মার্গারিটার সম্মানে নেপলস্ এর এক পিৎজা কারিগর রাফায়েল এস্পোসিতো জাতীয় পতাকার অনুকরনে রুটির ওপর টমেটো, মোজারেল্লা আর বেসিল পাতা দিয়ে পিৎজা বানায় যা রানির পছন্দ হওয়ার সাথে সাথে মার্গারিটা পিৎজা নামে রাজপরিবার এবং ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
খানিকক্ষনের মধ্যেই অর্ডার চলে এল। ডমিনোজ কিংবা পিৎজাহাটের চেনা প্যাকেজ নয়। থিনক্রাস্ট পিৎজা জিনিসটা আসলে নান্ রুটির ওপর চিজ, চিকেন আর টমেটো-ক্যাপসিকামের টপিংস। শস্তায় পুষ্টিকর খাবার নিঃসন্দেহে।
খেতে খেতে চোখ গেল দোকানের টিভিতে, এ দোকানের মালিক প্রত্যেক বছর একদিন রেকর্ড সাইজ পিৎজা বানায় মিডিয়ার সামনে- তার ভিডিও চলছে। এই বছর দক্ষিন ইটালির সবথেকে বড় পিৎজার রেকর্ড এই ভদ্রলোকের পকেটে। বিছানার চাদরের থেকেও বড় পিৎজা বানানো একা হাতে-এলেম লাগে বটে।
উদরপূর্তি করে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ১০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম হোটেলে। পাহাড়ের ঢালে সমুদ্রের পাশেই হোটেল- অথচ প্রায় শহরের মাঝখানে। মালপত্র রেখে ফ্রেশ হয়ে ঠিক করলাম খানিকক্ষন পরে শহরটা চক্কর মারতে বেরোবো।

Sorrento Street View 1.JPG

20150603_194813
৬০০ খ্রীষ্টপূর্বে সোরেন্টোর খোঁজ পাওয়া যায় গ্রীক উপনিবেশ সারেন্টাম নামে। পরবর্তী সময়ে রোমানদেরও পছন্দের এই শহর ব্যাবসা এবং বিলাসবাহুল্যে নজর কাড়ে দুনিয়ার। তিনদিকে সমুদ্র দিয়ে ঘেরা এই পাহাড়ি শহর আদতে একটা প্রাকৃতিক দুর্গ। শহরের একটা দিক পাহাড়ের প্রাচীরে সুরক্ষিত।শহরের যেকোনো উঁচু জায়গা থেকে দেখা যায় ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি।
বেশ ছিমছাম শহর। মূলত এখন পর্যটনের ওপরেই নির্ভরশীল এই জায়গা। শহরের বুকের ওপর প্রধান রাস্তার বিকেল ৫ টার পর থেকে ওয়াকিং স্ট্রিটে রূপান্তরন হয়। সবরকম গাড়ীর প্রবেশ নিষেধ। গরমের বিকেলে তখন রাস্তা হয়ে যায় রঙিন এক মেলা। জায়গায় জায়গায় পথচলতি রেঁস্তোরাগুলোর টেবিল সাজানো ফুটপাথে, জোড়ায় কিংবা দলবেঁধে পর্যটকরা আড্ডা, হাসি, হুল্লোড় আর খাওয়া-দাওয়ায় ব্যাস্ত। গড়িয়াহাটকে টেক্কা দিতে পারে মেয়েদের জন্য হালফ্যাশানের জামাকাপড় আর জাঙ্ক-জুয়েলারির স্টল, দোকানের মেলা। চারদিকে সেলের বিজ্ঞাপন চৈত্র সেলকেও হার মানাতে পারে।

20150601_121259 (2).jpg
চার-পাঁচটা ছেলে স্কেটবোর্ড নিয়ে কেরামতি দেখাতে দেখাতে পাশ দিয়ে চলে গেল। রাস্তার মাঝে একদল টিনএজার ব্যান্ড পারফর্ম করছে। পথচলতি মানুষজন খানিক দাঁড়িয়ে যাচ্ছে পারফরম্যান্স দেখতে। ভিড় ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে ডানদিকে বেঁকে ঢুকে পড়লাম স্থানীয় বাজারে। পাথরে বাঁধানো সরু রাস্তা এই শহরের বয়সের ছাপের আন্দাজ দিয়ে যায়। রকমারি হরেক রকম দোকান দুইপাশে পশরা সাজিয়ে বসে খদ্দেরের অপেক্ষায়। ওপেন এয়ার রেঁস্তোরার বাইরে একমনে মনকাড়া সুরে ভায়োলিন বাজিয়ে চলেছে হোটেলের মিউসিশিয়ান।

20150601_115923.jpg

 

হাঁটাহাঁটি অনেক হল। এবার পেটপুজোর পালা। ঘড়িতে ৮.৩০ হলেও সূর্য ডুবতে এখনও ঘন্টাখানেক বাকি যদিও। ওয়াকিং স্ট্রিটে একটা রেঁস্তোরায় ঢুকলাম। ভেতরের ভিড় দেখে বাইরে ওপেন এয়ার টেবিল বেছে নিলাম। মেনু বাছার আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম এই শহরের স্পেশাল কিছু ট্রাই করব। তাই অর্ডার দিলাম স্কুইড রোস্ট আর অক্টোপাশ ফ্রাই। পেল্লায় ডিশে সাথে প্রচুর অলিভ আর স্যালাডের সাথে পরিবেশন করে গেল ওয়েটার। অর্ধাঙ্গিনি যদিও প্রবলভাবে ভিন্নরুচি সহমত থেকে বিশেষ মতানৈক্যে গেলেন না। সামনের টানা রাস্তার একদিকে উঁচু পাহাড়, উল্টোদিকে কাছেই সমুদ্রের প্রানজুড়ানো হালকা নোনা হাওয়ায় বসে ভূরিভোজনে একটুও কমতি রাখলাম না। 
দিন যায় সন্ধ্যে ঢলে, সোরেন্টোকে ভালোই লাগে। কিন্তু সারাদিনের ধকলের পর আর পা চলছে না। অতএব রওনা দিলাম হোটেলের দিকে। কাল আবার সকাল থেকেই না হয় শুরু করব চরৈবতি।

 

Advertisements

About Swapratim

Author is Founder & Owner of Marvin.ai - Enterprise AI Chatbot Development Company. Currently he is busy developing chatbots for restaurants and other small & medium business domains. Marvin.ai has set foot in Denmark now. In his early career, he has worked in development & support perusing different roles & responsibilities. He also used to work on several innovative projects. Android apps developed by him like – In Time SMS, AndroLogic are freely available in Google Play Store. He has several in house tool built available for free usage on internet. Apart from this, he likes to share his learning with all which he had learned over years. The sole purpose of this blog is to share the author's knowledge in IT, passion for travel and recent trends with you. Hope you will enjoy his contents.
Aside | This entry was posted in Travel and tagged , , , , , , , , , , . Bookmark the permalink.

4 Responses to সোরেন্টোর পথে

  1. obaakkobita says:

    খুব ভাল

    Liked by 1 person

  2. Selfsame says:

    Amazing.

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s